ইউরেশিয়া কি আবার অশান্ত হয়ে উঠবে? - খবরের অন্তরালে

জাতীয়

সর্বশেষ সংবাদ

Sunday, 6 October 2019

ইউরেশিয়া কি আবার অশান্ত হয়ে উঠবে?

চির শান্ত ইউরেশিয়া আরো বেশি অশান্ত হওয়ার আভাস দিচ্ছে। ফোরাতের পূর্বাঞ্চলের কুর্দি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে তুরস্ক। আগেও এরকম ঘোষণা দিয়েছিল বেশ কয়েকবার। তবে সেগুলো আমেরিকার সাথে দরকষাকষির অংশ ছিল। এবারের ঘোষণা দেখে মনে হচ্ছে তুর্কিরা বেশ সিরিয়াস। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান আমেরিকাকে একরকম সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন। আমরা অনেক ধৈর্য্য ধরেছি, কূটনৈতিক চটুল কথা আর গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা নিজেরাই সেফ জোন প্রতিষ্ঠা করব।
তুরস্ক সিরিয়া ইরান এবং ইরাকের অংশ নিয়ে বৃহৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা নতুন না। আগে বহুবার ঘোষণা দিয়েও তারা সফল হয়নি।বৃহৎ শক্তিগুলো এই ইস্যুকে সব সময় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। ব্রিটেন ফ্রান্স রাশিয়া এবং এখন আমেরিকা, সাথে যোগ হয়েছে নতুন খেলোয়াড় ইজরাইল। ইরাকে এরই মধ্যে সফল হয়েছে, ইরাক এখন মূলত দ্বিখণ্ডিত। নামেমাত্র মানচিত্র ধরে রেখেছে। ভবিষ্যতে আরও একবার ভাঙতে পারে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ গোটা উত্তর সিরিয়া হাতছাড়া করতে প্রস্তুত। গোলান মালভূমিতে তিনি এবং তার পিতা তাই করে এসেছেন। ইরানের অল্পকিছু এলাকা কুর্দি অধ্যুষিত। তাই তারাও খুব একটা চিন্তিত নয়। তাছাড়া ইরান ইরান মনে করে যে সম্ভাব্য কুর্দি বিদ্রোহ দমন করার মতো ক্ষমতা তাদের আছে। তাই তারাও এই বিষয়ে খুব বেশি টেনসনে নেই। টেনশন এ আছে তুরস্ক। তুরস্কে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের বিশাল এলাকা কুর্দি অধ্যুষিত। যেকোনো কুর্দি বিচ্ছিন্ন বা তুরস্কের ধমনীতে টান দেবে। চার দশক ধরে দেশটি পিকেকে গেরিলাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতায় মোকাবেলা করে আসছে। প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছে তাদেরকে। এতদিন দেস্টিনিজ ভূমি এবং উত্তর ইরাকের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে পরিচালিত গেরিলা হামলা মোকাবেলা করত। কিন্তু এবার আরও একটি ফ্রন্ট যোগ হয়েছে, এবং একটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফ্রন্ট। আমেরিকার সহায়তায় কুর্দি যোদ্ধারা এখন একরকম মিনি রাষ্ট্র গঠন করেছে। উত্তর সিরিয়ায় বৃহৎ এলাকা জুড়ে। এটা যে কেবল কুরদি এলাকায় গঠন করা হয়েছে সেটা নয় বরং প্রচুর আরব অধ্যুষিত শহর কেউ তারা নিজেদের দখলে নিয়েছে এবং সেখানে জাতিগত উচ্ছেদ চালানের মাধ্যমে কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমেরিকায় স্পষ্টভাবে সিরিয়াকে দ্বিখন্ডিত করার পথে এগোচ্ছে। এটা তুরস্কের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তুরস্কের ভৌগলিক এরকম যে দেশটিকে সবসময় সুপারপাওয়ার দের ভারসাম্যের উপর দৃষ্টি রেখে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। ওসমানী আমলের ওইটা দেখা গেছে। তাই উসমানি খেলাফতের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই যে, কতনের দিনগুলোতে খেলাফত কি ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলোর সাথে শত্রু-মিত্রের জটিল খেলায় মেতে থাকতে হয়েছে। সুলতান আব্দুল হামিদের পুরা শাসনকাল কেটেছে এরকম ইঁদুর বিড়াল খেলা। পূর্ব ইউরোপে এবং ক্রিমিয়ায় রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে অ্যাংলো পরাশিদের পরাশক্তির সাথে জোট করতে হয়েছে ওসমানীয়দের কে। আবার জার্মানদের সাথে মিলে এংলো ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছে। এই ইংরেজরাই ওসমানীয়দের হাত থেকে গোটা আরব এবং সাইপ্রাস কেড়ে নেয়। আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্কের অভ্যুদয়ের পরেও এই সমীকরণ থেকে যায়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জয়লাভ করা স্টালিন হুট করে বসফরাসের উপর রাশিয়ার অধিকার দাবী করে বসে। এমনকি করবোনা গ্রানাডা ইস্তানবুল দখল করে পুনরায় কনস্টান্টিপোল বানানোর গোপন ইচ্ছা পোষণ করে। বাধ্য হয়ে তুরস্ককে ন্যাটোর আশ্রয় নিতে হয়। সিরিয়া যুদ্ধে ও তুরস্ক প্রথমে পশ্চিমা জোটে ছিল। ওরে রুশ বিমান ভূপাতিত করার ঘটনার পর যখন দেখল যে তুরস্ককে রাশিয়ার সামনে ফেলে পশ্চিমারা চুপ করে পিছু হটেছে। তখন তুরস্ক নিজেই দাবার ছক ভেঙ্গে দেয়। নতুনভাবে চাল দেয়া আরম্ভ করে। রাশিয়াকে আপাতত মিত্র হিসেবে দরকার।তুরস্কের চ্যালেঞ্জ কেবল সিরিয়াল তারচেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ সাইপ্রাস। এবং ভূমধ্যসাগর। এই ফ্রন্টে আমেরিকা ইউরোপ এবং ইসরাইল স্পষ্টভাবে তুরস্কের বিরোধী ফ্রন্টে থাকবে। সেখানে রাশিয়ার সহায়তার দরকার হবে তুরস্কের। এভাবেই ইউরেশিয়ার রাজনীতিতে প্রতিনিয়ত শত্রু-মিত্রের দেয়াল ভাঙ্গে আর গড়ে ওঠে। আজকের শত্রু আগামীকাল মিত্র হয়। আবার এখনের মিত্র দুইদিন এর ব্যবধানে শত্রুতে পরিণত হয়।
রাশিয়ার সাথে তুরস্কের স্ট্যাটিজিক মৈত্রী হতে পারে না। এখন যেটা আছে সেটা স্বার্থ কেন্দ্রিক ট্যাকটিক্যাল। কারণ মধ্য এশিয়া পূর্ব ইউরোপ এবং কৃষ্ণসাগরে রুশ তুর্কি স্বার্থ বিপরীতমুখী। সিরিয়ায় ও তাই। এই অঞ্চলগুলোতে তুরস্কের সাথে অচিরেই রাশিয়ার দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠবে। রাশিয়ার প্রভাবাধীন মধ্যে এশিয়ার তুর্কি প্রজাতন্ত্র গুলোতে রাশিয়ায় এখনই তুরস্কের গরম বাতাস পাচ্ছে। এটা নিয়ে ইতিমধ্যেই ক্রেমলিন নড়েচড়ে বসার ইঙ্গিতই দিচ্ছে। সামরিক প্রযুক্তিতে তুরস্ক যে গতিতে এগুচ্ছে তাতে দ্রুতই রাশিয়ার সাথে ধাক্কা লাগবে। প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নেও আবার অস্ত্রের বাজার ধরার প্রশ্ন। তাই ভবিষ্যতে তুরস্কের জন্য ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রয়োজন থেকে যাচ্ছে।
পূর্ব-ফোরাত এবং ভূমধ্যসাগর: অশান্ত হতে পারে ইউরেশিয়া।
এতকিছুর পরেও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। তিনি এবার সরাসরি আমেরিকার মুখোমুখি হতে চান। পূর্ব ফোরাত মার্কিন সৈন্য এবং কুর্দিদের দখলে। সেখানে অভিযান চালানো মানে তুর্কি এবং মার্কিন সেনারা মুখোমুখি হওয়া। এটা অনেক রিক্স কিন্তু এরদোগানের ঝুঁকি নিতে চান। কারণ তিনি নিজেই এক ভাষণে বলেছিলেন আমরা যদি আজ উত্তর সিরিয়ায় না ঢুকি তাহলে জাতি ভবিষ্যতে এর কয়েকগুণ বেশি মূল্য দিতে হবে।
তুরস্কে টার্গেট হচ্ছে তুর্কি সীমান্তবর্তী উত্তর সিরিয়ার ৩০ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত একটি সেইফ জোন একজন করিডর নির্মাণ করা। যাতে করে সেখানে তুরস্কর আশ্রয় নেওয়া ৩০ লক্ষ সিরিয়ান শরণার্থীর পূর্নবাসন করা যায় এর কারণ মূলত দুইটি।
১. এই এলাকায় আরব সিরিয়ানদেরকে পূনর্বাসন করে সিরিয়া এবং তুরষ্কের কুর্দি এলাকার মধ্যে একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা, যাতে দুই অঞ্চলের কুর্দী বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর মধ্যকার সংযোগ বাধাগ্রস্ত করা যায়।
২. সিরিয়ায় সাংবিধানিক কমিটি গঠিনের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে সব পক্ষ। এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে, সিরিয়া সংকটের একটা জোড়াতালি সমাধান ওরা দিয়ে দিবে। যদি এরকম কিছু হয়ে যায় তাহলে তুরষ্ক সিরিয়ান শরনার্থীদেরকে নিয়ে বিপদে পড়ে যাবে। দামেশক সরকার তাদেরকে গ্রহন করার ব্যাপারে গড়িমসি করবে। এমনকি বিশ্বাসঘাতক রাষ্ট্রদ্রোহী বলে নাগরিকত্ব থেকেও বঞ্চিত করতে পারে ওদেরকে। তখন তুরষ্কের চিৎকার কেউ শুনবে না। তাই তারা এখনই এই সমস্যার সমাধান করতে চায়। আর যদি সিরীয় সঙ্ঘাত দ্রুত শেষ না-ও হয়, তবুও এরদোগান দ্রুত শরনার্থী সমস্যার সমাধান করতে চান। এইটার কারণে তার জনপ্রিয়তা ধাক্কা খেয়েছে এবং ফলশ্রুতিতে ইস্তাম্বুলকে হারাতে হয়েছে। ২০২২ এর আগেই এই ইমেজটা তিনি মুছতে চান।
তুরস্ক এখানে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন ইস্যুতে ইমপিচমেন্ট এর মুখে ডেমোক্র্যাটরা এবং রিপাবলিকানরা মুখোমুখি অবস্থানে। ইরান ইস্যুতে অামেরিকা চাপের মুখে। ইরানকে পারছে না পিসতে
আবার হজম করতে পারছেনা এমবিবিএস এবং এম বি জেড এর হাতে লাগাম দেওয়ার ফলে এই দুই গবেট যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে সেগুলো সামাল দিতে হচ্ছে সবমিলিয়ে আমেরিকা বেশ অসুবিধায় আছে এটা সুযোগ নিতে চায় তুরস্ক।
কিন্তু আমেরিকার হাত অনেক লম্বা তুরস্কের মত আঞ্চলিক পরাশক্তি কে সামাল দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমেরিকার আছে। এরদোগান অভিযানের ঘোষণার পরপরই মিশর হঠাৎ করে তুরস্ককে হুমকি দিয়ে বসেছে। মিশর বিবৃতিতে বলেছে অপূর্ব ভূমধ্যসাগর সাইপ্রাসের পানিসীমায় তুরস্কের গ্যাস অনুসন্ধান বেআইনি। এটা অব্যাহত রাখলে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য তুরস্ক দায়ী থাকবে। মানে স্পষ্ট যুদ্ধের হুমকি। এটা তুর্কি সাইপ্রাস ইস্যু কিছু বললে সাইপ্রাস বলবে বড়জোর অথবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কথা বলবে মিশরের সাথে কি সম্পর্ক। তবুও তারাই হুমকি দিচ্ছে এটা কি কাকতালীয়।মোটেও না স্পষ্টত মার্কিন নির্দেশে মিশরে বিবৃতি দিয়েছে। প্রয়োজনীয় আমেরিকা তুরস্কের বিরুদ্ধে মিশরকে প্রক্সি যুদ্ধে জড়াতে পারে এর ইঙ্গিত দিল।
অতীতেও মিসর উসমানীয়দের জন্য গলার কাঁটার মতো ছিলো। প্রথমে আলী বেগের নেতৃত্বে মামলূকরা এবং পরে মুহাম্মাদ আলী পাশা উসমানীদেরকে কম ভোগাননি। মুহাম্মাদ আলী পাশাতো একবার উসমানীয়দেরকে পরাজিত করে গোটা শাম দখল করে আনাতুলিয়ায় পদার্পন করেছিলেন। পরে বৃটিশদের সহায়তায় শান্তি চুক্তি হলে উসমানী খেলাফত রক্ষা পায়।
এখনও তুরষ্কের জন্য মিসর প্রকৃতপক্ষেই হুমকী হয়ে উঠবে। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের রেংকিংএ তুরষ্ক ৯ নম্বরে থাকলেও মিসরের অবস্থান ১২ তে। তাছাড়া মিসরের নৌশক্তি তুর্কি নৌশক্তি থেকে বেশ এগিয়ে থাকবে। নেভাল শিপের সংখ্যার দিক দিয়ে মিসরকে ৬ নং নৌশক্তির দেশ ধরা হয়। ফ্রান্সের তৈরি দু'টি মিস্ট্রাল হেলিকপ্টারবাহী রনতরী আছে। মিসরের বিমানবাহিনীও বেশ বড়। তুরষ্কের হাতে এখনো কোন বিমানবাহী রনতরী নেই। নিজস্ব প্রযুক্তির রনতরী 'আনাদোলু' এখনো সার্ভিসে আসেনি। সবমিলিয়ে মিসর তুরষ্কের জন্য বড় রকমের হুমকী।
যদি তুরষ্ক সত্যিই পূর্ব ফোরাতে প্রবেশ করে তাহলে আমেরিকা নিশ্চুপ থাকবে বলে মনে হয় না। অর্থনৈতিক অবরোধের পাশাপাশি প্রক্সি ওয়ারে জড়িয়ে তুরষ্ককে বধ করতে চাইবে। সব মিলিয়ে ইউরেশিয়া আবারো অশান্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ভূমধ্যসাগরের পানি লাল হলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।
সংগৃহীত অনলাইন থেকে।

No comments:

Post a Comment

Home