শত্রুদের চোখে! মিশরের অবিসংবাদিত নেতা মোহাম্মদ মুরসি - খবরের অন্তরালে

জাতীয়

সর্বশেষ সংবাদ

Monday, 17 June 2019

শত্রুদের চোখে! মিশরের অবিসংবাদিত নেতা মোহাম্মদ মুরসি


মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় এসে বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যেগুলো শত্রুদের ছিল মারাত্মক ভুল হয়তো তার জন্যই তাকে আজ এই ভাবে শাহাদাত বরণ করতে হলো।
ক্ষমতায় এসেই মোহাম্মদ মুরসি অনেকগুলো দেশ ভ্রমণ করেছিলেন একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ওই দেশগুলো মিশরের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।
তিনি চায়না দিয়ে শুরু করেছিলেন তার ভ্রমণ এরপরে একে একে জান রাশিয়ায় ব্রাজিল তারপর পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকা। তারপরে গেলেন রসৌদি আরব কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কিন্তু ভুলেও তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকান নি আমেরিকা যাওয়ার নিয়ত করেন নি তিনি এমনকি যে আমেরিকার টাকা মিশরের সেনাবাহিনীকে আনোয়ার সাদাত থেকে শুরু করে পেট মোটা করতে সাহায্য করল সেই আমেরিকার প্রতি খুব উঁচু নজরে তাকিয়েছেন তিনি কয়েকবার যার জন্য তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করতে পারেননি।
২০১২ সালের ফিলিস্তিনের গাজা তে ইজরাইল কর্তৃপক্ষ জোর করে অভিবাসনের চেষ্টা করে ফিলিস্তিনের আন্দোলনকারীরা স্বাধীনতার জন্য নিজ মাতৃভূমি রক্ষার জন্য যুদ্ধরত হামাসের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ। এর নাম দেওয়া হয় হিজরাতুল সিজৃজীল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ইজরায়েলের কলিজায় ঝলসে যাওয়া শুরু হয় মোহাম্মদ মুরসির জন্য। সিংহের মত হুঙ্কার ছাড়েন মোহাম্মদ মুরসি মনে রেখো ফিলিস্তিনিরা একা নয়।
তখন মুরসি অতি দ্রুততার সাথে তেল আবিব থেকে মিশরের দূতাবাস প্রত্যাহার করে নেন তার প্রধানমন্ত্রী কে গাঁজা তে পাঠালেন সাহায্যের জন্য যিনি হামাসের সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে পরিপূর্ণ ঐক্যমত ঘোষণা করে আসেন খুলে দেন মিশর ফিলিস্তিনি এর সাথে সংযুক্ত রাফা সুরঙ্গ এবং দ্রুত যুদ্ধ দিতে বাধ্য করেন ইসরাইলকে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি আরব বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতার মর্যাদায় উন্নতি হলেন আর অন্য অন্য আরব নেতাদের মনে ঢেলে দিলেন হিংসার আগুন আমেরিকার কয়েকটি গণমাধ্যমে তখন মোহাম্মদ মুরসিকে আরব বিশ্বের একমাত্র ইসলামিক নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন নিউইয়র্ক টাইমস তাকে পৃথিবীর প্রথম ১০০ নেতার মর্যাদায় ভূষিত করে।
সুয়েজ খালের উন্নয়নের জন্য তিনি বিরাট অংকের বাজেট নির্ধারণ করেন এতে অর্থনীতিবিদরা মনে করলো আগামী ২০২২ সালের মধ্যে এখান থেকে মিশরের আয় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে তাই যদি হয় মিশর পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহের কাতারে দাঁড়িয়ে যাবে আর এটা হলে আরব দেশগুলোতে আমেরিকার মাতব্বরি থাকবে না এছাড়া ইসরাইলের সিনাই পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এক সেমিনারে বলেন মোহাম্মদ মুরসির উন্নয়ন প্লান বাস্তবায়ন হলে আরব আমিরাতের অর্থনীতিতে বিশেষ করে দুবাইয়ে মারাত্মক ধস নেমে আসবে। কারণ দুবাই এবং আবুধাবির বন্দরগুলো তখন মূল্য হারিয়ে ফেলবে। হলে আমেরিকার অর্থনীতিতে দুবাই থেকে আসা সুবিধা আর থাকবে না টানাটানিতে পড়বে সবাই কি মারাত্মক পরিকল্পনা ছিল মোহাম্মদ মুরসির।
মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় যেতে না যেতেই সিনাই এ উন্নয়ন কাজ শুরু করে দেন সিনাই আছে মিশরের 31 ভাগ ভূমি এর কোন উন্নয়ন এতদিন হয়নি এই ভূখণ্ড উন্নত হলে মিশরের ইনকাম চলে যাবে দ্বিগুণে চাকুরীর সুযোগ পাবে হাজার হাজার হাজার মিশরীয় যুবক ফলে তিনি ৪.৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট ঘোষণা করেন ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। মিশরের সেনাবাহিনীকে ও এলাকার উন্নয়নে শরিক রাখতে ২.৫ বিলিয়ন ডলার বাজেটের ঘোষণা দেন। ফাইরুজ মিলিয়ন সিটি নামে এখানে বসবাস এর সমস্ত সুযোগসহ উন্নত ও বিশাল শহর নির্মাণের কাজ শুরু করেন সিনাই এর উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিভার্সিটি তৈরি করার জন্য অফিশিয়াল কাজ শুরু করেন প্রেসিডেন্ট মুরসি। ঘোষণা করেন ছাত্রদের জন্য দারুন স্কলারশিপের এটা ছিল ইসরাইলের সিনাই দখল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা। এত বড় কাজ তার আগে আজ পর্যন্ত কেউ মিশরের করার সাহস দেখাতে পারেননি।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির চিন্তা ছিল মিশরের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া কাজেই ক্ষমতায় যেতে দেরি না করে নতুন খাদ্যগুদাম বানানো শুরু করেন তিনি। তিনি কৃষকদের কৃষি কাজে উৎসাহিত করার জন্য বহু রকম সহযোগিতা ও ঋণদান কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এখানে মনে রাখা দরকার মিশর আরব বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খাদ্য আমদানি করা রাষ্ট্র ২০০৯ সাল থেকে মিশর শিকাগো থেকে ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন গম আমদানি করেন।
খাদ্য আমদানির সাড়ে চুয়াল্লিশ ভাগ আমেরিকা থেকে, বাইশ দশমিক সাত ভাগ অস্ট্রেলিয়া থেকে, বার দশমিক সাত ভাগ ইউরোপ থেকে, তিন দশমিক ছয় ভাগ কানাডা থেকে এসে থাকে। এই দেশ গুলো এক সাথেই আইএমএফকে মিশরে কোন ধরণের অর্থ দিতে নিষেধ করে। সমস্ত আরব রাস্ট্র গুলোকেও নির্দেশ দেয়া হয় মিশরকে যেন এক পয়সাও ঋণ সাহায্য না দেয়া হয়। মুরসীর এতবড় পদক্ষেপ তারা সহ্য করতে পারেনি।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার জন্য মোহাম্মদ মুরসি প্রাথমিক সেকেন্ডারি এবং হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল গুলোতে পাশ্চাত্য সিলেবাস বাতিল করার পদক্ষেপ নেন। শুধু তাই নয় পশ্চিমা মানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থার নির্দেশ দেন তিনি যাতে মিশরের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রাধান্য বেশি। এটা বাস্তবায়ন হলে দেখা যেত ওখানে নিয়ে যেত হাজারো আমেরিকান ও পশ্চিমা শিক্ষক এবং উপদেষ্টাদের ছাটাই করতে হতো। এটা ছিল মারাত্মক পদক্ষেপ বিদেশী বেনিয়াদের ক্ষেপিয়ে তোলে বাইরের লোকদের কাছে না পড়লে পড়াশোনা হয়?
সিরিয়ার ব্যাপারে মোহাম্মদ মুরসি নিয়ে ফেলেন এক মারাত্মক পদক্ষেপ তিনি মিশরের প্রবেশ করতে সিরিয়ানদের উপর থেকে ভিসা ফি উঠিয়ে দেন তিনি ঘোষণা করেন সিরিয়াল ছাত্ররা মিশরীয় সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। তিনি সিরিয়ার সাথে সকল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে দামেস্ক থেকে মিশর দূতাবাস প্রত্যাহার করে নেন এবং বন্ধ করে দেন কায়রোয় সিরিয়ান দূতাবাসের সকল কার্যক্রম। আরো মারাত্মক কাজ করেন তিনি সিরিয়ার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন পরামর্শ তিনি শুনতে চাননি।
এই ভাবেই গণতান্ত্রিক মিশরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী আরববিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেন মোহাম্মদ মুরসি, যার কারণে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে চরম শত্রুতে পরিণত হন, যার খেসারত দিতে হয়েছিল তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেলখানায় বন্দি রাখা। অবশেষে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল এই মহা মনিষী কে, আর মুসলিম বিশ্ব হারালেন এক মজলুম জননেতা।

লেখকঃ আব্দুস সালাম আজাদী।

No comments:

Post a Comment

Home