জনগণই সকল ক্ষমতার উৎসঃ বিশ্বাস করতেন মেজর জিয়াউর রহমান - খবরের অন্তরালে

জাতীয়

সর্বশেষ সংবাদ

Wednesday, 29 May 2019

জনগণই সকল ক্ষমতার উৎসঃ বিশ্বাস করতেন মেজর জিয়াউর রহমান

জিয়াউর রহমান এক দেশ জোড়া জগৎজোড়া নাম এই নামে একজন রাষ্ট্রপতি এই নাম একজন মহান রাষ্ট্রনায়কের মহান তিনি জীবনাদর্শে চিন্তা চেতনায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতা।
হাজার 971 এর 25 শে মার্চের সেই ভয়াল কাল রাতে যখন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা অপারেশন সার্চলাইট নামের পোড়ামাটির নীতি জ্বালাও-পোড়াও হত্যা করো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশজুড়ে গণহত্যা শুরু করে তখনই চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল উপ অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান তার সহযোদ্ধাদের বলেন তোমাদের সিদ্ধান্তে তোমাদের কাছে কিন্তু আমি আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি টু বি অর নট টু বি আর নয় আমি বিদ্রোহ করলাম।
সহযোদ্ধারা রেজিমেন্টের সৈনিকরা সবাই তার কথার প্রতিধ্বনি করে সমস্বরে বলে উঠলো আই নো উই ওই আমরা বিদ্রোহ করলাম 27 মার্চ মেজর জিয়া কর্ণফুলী নদী অতিক্রম করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল নিয়ে প্রথমে নিজ নামে পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র উচ্চারণ করেন।
তিনি দেশবাসীকে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে আহ্বান জানান ভেসে আসা তার কণ্ঠের ঘোষণা পথে-প্রান্তরে নগর বন্দরে বিস্তীর্ণ বাংলাদেশের প্রতি কোনায় কোনায় প্রতিধ্বনিত হয়েছিল বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ শুনেছিল শুনেছিল বিশ্ববাসী ও।
চট্টগ্রাম অবস্থানরত মেজর জিয়ার রেডিও ঘোষণা ও তার নেতৃত্বে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর মুক্তিযুদ্ধের ঝাঁপিয়ে পড়া সব সেনা ছাউনির বেঙ্গল রেজিমেন্ট গুলো ও অন্যান্য বাঙালি সৈনিকদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে অনুপ্রাণিত করে তারা অন্ধকারের দিশা ভ্রান্তি কাটিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা লাভ করে।
ঢাকার অদূরবর্তী জয়দেবপুরে অবস্থানরত উপ-অধিনায়ক মেজর শফিউল্লাহ নেতৃত্বে দ্বিতীয় ওয়েস্টবেঙ্গল কমিল্লা সেনাছাউনিতে অবস্থানরত অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
একইভাবে জাতি পরে যশোর সেনানিবাসে অবস্থানরত প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও সৈয়দপুর সেনানিবাসের অবস্থানরত তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর পরের ইতিহাস রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
রক্তের অক্ষরে লেখা এক অনবদ্য গৌরবগাথা এক বিয়ে জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতার এক অমর আখ্যান আর এই অগ্নি আখ্যানের অগ্নিপুরুষ অগ্নিপথ এর অগ্রযাত্রা মেজর জিয়াউর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধে আমরা জিয়াকে দেখেছি ক্লান্তিহীন যুদ্ধরত সেক্টর অধিনায়ক রূপে বি গ্রেড হিসেবে প্রথম গঠিত জেড ফোর্স কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা দুর্দমনীয় দুঃসাহসী ও অতুলনীয় তার সাহস সূর্য অধিনায়কোচিত ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রতিটি অনুপ্রাণিত করেছিল সাহস যুগিয়েছিল মনোবল অটুট রেখেছিল যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করেছিল।
15 ই আগস্ট 1975 জাতির ইতিহাসের এক মহা কলঙ্কিত দিন সেই দিন মধ্য রাতের এক হৃদয়বিদারক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জাতীয় সত্তা স্বাধীনতার মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
রক্তমাখা হাতে তার দলের এক শীর্ষ নেতা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নেন আকস্মিক অতর্কিতভাবে সামরিক শাসন জারি করে আর এই সামরিক শাসন জারি করেন কোন সামরিক ব্যক্তিত্ব সোজাসাপ্টা কথা ক্ষমতালিপ্সু ষড়যন্ত্রকারী দলীয় রাজনীতির চক্র ‌। গভীর এক অনিশ্চয়তা এক মহা অস্থিরতা নেমে আসে সারাদেশে স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীর ঢেউ আছে পরে।
আমরা দেখেছি মানুষ সব পোশাক তৈরির নভেম্বরের শুরুর দিনগুলোর দেশে এক চরম নৈরাজ্য এক সীমাহীন হতাশা অস্থিরতা নিরাপত্তাহীনতায় গোটা জাতিকে সংকটাপন্ন করে তোলে একটা ভয়ংকর ঝুকির দিকে ঠেলে দেয় দেশ তখন সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন কোন সরকার নেই প্রশাসন নেই কোন যোগাযোগ নেই।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রপতি বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে কোথায় যেন ছিটকে পড়েছে হারিয়ে গেছে এ পটভূমিকায় 7 ই নভেম্বর দেশজুড়ে ভোটে সৈনিক জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান জাতির ভাগ্য আকাশে ছিল কঠিন যুগ সন্ধিক্ষণ এক প্রণয়নকারী ঝড়।
সিপাহী জনতার উত্তাল তরঙ্গ মিলায়ে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান উঠে আসেন জাতীয় নেতৃত্বের অসীম শূন্যতায় সময়টা ছিল জাতির জন্য শক্তি চরম ঝুঁকিপূর্ণ। মহা ক্লান্তিলগ্নে সেনাবাহিনীতে কোন শৃঙ্খলা নেই নেই চেইন অফ কমান্ড।
সৈনিকরা সেনা ছাউনি থেকে বেরিয়ে সবাই রাজপথে লোকালয় জনতার সঙ্গে অস্ত্র হাতে জিয়ার জন্য এটা ছিল এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও চেইন অফ কমান্ড ফিরিয়ে আনা তখন সহজ কাজ ছিল না।
খাচা থেকে যেন বাঘ লোকালয়ে বেরিয়ে এসেছে তাকে আবার ব্যারাকের মধ্যে ফিরিয়ে আনা কঠিন জেনারেল জিয়ার ব্যক্তিত্ব অসীম সাহসিকতা আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা সেনাবাহিনীর চরম আস্তা জাতীয় সঙ্কট উত্তরণে সাহায্য করে।
জেনারেল জিয়াউর রহমান উল্কার মতো ছুটে চলেছেন প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত এক সেনানিবাস থেকে আরেক সেনানিবাস এক দেশ থেকে আরেক বিগ্রেডের এক মিনিট থেকে আরও কেউ নিতে বাংলাদেশের প্রতিটি সেনাছাউনিতে বেরিয়েছেন জনতার ঢল এর মধ্যে দিয়ে দীপ্ত করে সামনে এগিয়ে চলেছে।
আমার মনে পড়ে ঢাকা সেনানিবাসে তিনি এই সময় এক সৈনিক দরবারে এসেছিলেন মাঠে অস্ত্র উঁচিয়ে অবস্থান করেন কে চতুর্দিকে মহামন্ত্র গান জিয়া ভাই জিয়া ভাই ঢাকা সেনানিবাসের আকাশ বাতাস মুখরিত পতাকাবাহী গাড়ি রাস্তায় রেখে তিনি সৈনিকদের ঠিক মাঝখানে চলে আসেন।
মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করেন, ‘shut-up. I am not Zia Bhai. I am bloody well your Chief. Behave properly. তোমরা সবাই চুপ করো। আমি তোমাদের ভাই নই। আমি তোমাদের সেনাপ্রধান। সাবধানে কথা বল।
সেনা শৃঙ্খলা ভঙ্গ আমি কখনো সহ্য করব না তিনি সবাইকে বেড়াতে যাওয়ার আদেশ দেন অস্ত্র জমা দিতে বলেন এবং সিন অফ কমান্ড এ ফিরে আসতে বলেন অবাক বিস্ময় আমি লক্ষ্য করি মুহূর্তের মধ্যে সব কোলাহল স্তব্ধ সৈনিকরা লাইন ধরে একে একে শৃংখলার সঙ্গে আপন আপন ইউনিটের দিকে হেঁটে চলেছে।
আমার কাছে সেদিন জিয়াউর রহমানকে মনে হয়েছিল তিনি যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা যার বাঁশির সুরে ও মিলন নগরীর সব শিশু-কিশোর যে যেখানে ছিল তার পিছনে পিছনে ছুটে চলেছে।
জেনারেল জিয়া তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হীনমন্যতায় ভোগা রাজনৈতিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কে তার প্রাইজ ফিরিয়ে দেন তিনি সেনাবাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন অন্য গঠনের উদ্যোগ নেন।
সেনাবাহিনীকে সুপ্রশিক্ষিত পেশাগতভাবে সুদক্ষ অস্ত্রে সুসজ্জিত করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক মনোযোগ দেন অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যখন দেশ প্রেম সেনাবাহিনী হিসেবে জনগণের পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা অর্জন করেন ‌
জিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন জণগণ এবং জণগণই একমাত্র সব ক্ষমতার উৎস। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে প্রথম যে কাজটি করেন তা হল সামরিক সরকারের পূর্ণ বেসামরিকীকরণ। তিনি সব রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্র চর্চার পূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।
আওয়ামী লীগ তখন একটা কঠিন সময় অতিক্রম করছিল। দলের অনেক শীর্ষ নেতা মোশতাক সরকারে যোগদান করেছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছিলেন। জিয়া তাকে নিজ দেশে সম্মানে ফিরে আসার সাদর আহ্বান জানান। তাকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পূর্ণ সহযোগিতার নিশ্চয়তা প্রদান করেন।
বাংলাদেশের তদানীন্তন রাজনীতির বাস্তবতা জেনারেল জিয়াকে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে বাধ্য করে। তার ছিল গণতন্ত্রের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস। সত্যিকারের গণতন্ত্রের চেতনায় তাড়িত হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম সুযোগেই তিনি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন ঘটান। সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন। অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি কৃষিবিপ্লব ও শিল্পের বিকাশ ঘটান। জাতিকে একটি মর্যাদাশীল সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড় করান।
জিয়া সেনাবাহিনী থেকে মেয়াদ পূরণের অনেক আগেই নজিরবিহীনভাবে স্বেচ্ছায় পূর্ণ অবসর গ্রহণ করেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে তিনি নিজে দল গঠন করেন।
তিনি বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে পথে-প্রান্তরে বিরামহীনভাবে ঘুরে বেড়ান। জণগণের সঙ্গে তাদেরই পরিবারের একজন হয়ে যান। তিনি শতশত মাইল হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে বেড়ান। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শোনেন। সাহস জোগান।
মানুষ তাকে আপন করে নেয়। গৃহবধূরা তাকে বাড়ির ভেতরে উঠানে নিয়ে বসায়। রান্নাঘরে মাটির সানকিতে ঘরে যা আছে খেতে দেয়। বৃদ্ধারা শুধু মাথায় হাত রেখে দোয়া করে। আবালবৃদ্ধবনিতা হ্যামিলনের সেই বংশীবাদকের মতো তার পেছনে স্রোতধারার মতো ছুটে চলে।
বিশ্বে তিনি খ্যাত হন চারণ রাষ্ট্রপতি নামে। একজন সমর নায়কের এমন আমূল পরিবর্তন, রণ থেকে জনে এমন বিশাল বিবর্তন সত্যি বিরল। সমর নায়ক জিয়া নিজেকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিলে তিলে নির্মাণ করতে পেরেছিলেন নিখাদ, নিষ্কলুষ এক জনগণমন অধিনায়ক জিয়া করে।
জিয়াকে তার শাহাদাতবার্ষিকীতে আমার হৃদয় উজাড় করা বিনম্র শ্রদ্ধা।
লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান : সাবেক
সেনাপ্রধান
দৈনিক যুগান্তর অবলম্বনে।

No comments:

Post a Comment

Home