সেই বালিশ মাসুদের খোলা চিঠি! - খবরের অন্তরালে

জাতীয়

সর্বশেষ সংবাদ

Thursday, 23 May 2019

সেই বালিশ মাসুদের খোলা চিঠি!

আমার নাম এখন দেশের বিদেশের প্রায় সব বাঙালি জেনে গেছেন। জি হ্যাঁ আমি সেই নির্বাহী প্রকৌশলী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাসুদুল আলম। যাকে এখন ব্যঙ্গ করে আপনারা বালিশ মাসুদ বলে সম্বোধন করেন। আমি আমার সমস্ত দোষ স্বীকার করিনি আপনাদের কাছে কিছু কথা বলতে চাই।
শৈশবে আমার কেরানি বাবা আমার জন্য চার পাঁচটা গৃহশিক্ষক রেখে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। আমাকে তিনি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চেয়েছিলেন আমি অবশেষে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি আসলে আমার কোনো শৈশব ছিল না।
আমি কারো সাথে মিশি নি কারো বন্ধু ছিলাম না এমনকি ক্লাসে ফার্স্ট হবার জন্য বাবা-মায়ের কথামতো ক্লাসের বন্ধুদের ও কখনো লেখাপড়ার কোন সাহায্য করি নি এই জন্য যে যদি তারা আমার চেয়ে ভালো রেজাল্ট করে ফেলে তাই আমার মধ্যে কোন মানবিক গুণাবলির উন্নয়ন ঘটেনি শুধু ভাল ছাত্র হওয়া ছাড়া।
আমি যখন যা চেয়েছি কেরানি বাবা তার চেয়ে আমাকে অনেক বেশি দিয়েছেন বলেছে তোমার সব চাহিদা আমি পূরণ করবো তুমি শুধু আমার একটা চাহিদা পূরণ করবে সেটা হলো ভালো রেজাল্ট করে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে আর অনেক টাকা আয় করবে তাই আমার ধ্যান-জ্ঞান সবই ছিল লেখাপড়ায় ভালো করা।
আমি যখন ছোট তখন দেখেছি প্রায় প্রতিদিন বাবা অফিস থেকে ফিরে মাকে অনেক টাকা দিতেন আমি ভাবতাম চাকরি করলে মনে হয় প্রতিদিন টাকা পাওয়া যায় একটু বড় হবার পরে দেখি বাবা প্রায় বিভিন্ন লোকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতেন।
মাঝে মাঝে বলতেন তিনি এখন বাইরে যাচ্ছেন দুই তিন দিন বাসায় আসবেন না তার পরেও দেখতাম তিনি বাসায়। আবার কেউ নিজে এলে কাজের লোক দিয়ে বলতেন বল আমি ঢাকার বাইরে বাসায় বসে এমন মিথ্যা বলতেন তিনি কিন্তু কেন?
পরে জেনেছি তিনি কিছু লুকানোর জন্য বা কাউকে এড়িয়ে চলার জন্য মিথ্যা বলতেন আমি একদিন মাকে বললাম তোমরা সব সময় আমাকে সত্য কথা বলতে বলো কিন্তু বাবা তো মাঝে মাঝে বাসায় থেকেও বলে তিনি বাসায় থাকবেন না বাইরে আছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
এটা কি মিথ্যা কথা মা বলতেন মাঝে মাঝে এমন দুই একটা মিথ্যা কথা বলার দরকার হয় বড় হলে বুঝবি আমি কনফিউজড হয়ে যেতাম তখন কিন্তু এখন সব বুঝি।
যখন ইউনিভার্সিটি তে পড়তাম তখন জানলাম আমার বাবা যে বেতন পান তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা আমার প্রতি মাসে খরচ করি এমনকি আমার বাবা বেতনের টাকায় আমার পড়ার খরচ ও ঠিকমতো হবার কথা ছিল না।
বন্ধুরাও আড়ালে-আবডালে আমার বাবার আয় নিয়ে টিটকারি করতো আমি বুঝতাম কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না আমার বন্ধুদের অনেকে দেখতাম আমার মত পরিবার থেকে এসেছে।
তাদের সাথে আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব করে নিলাম আর প্রতিজ্ঞা করলাম যে অনেক টাকা আয় করে টাকা দিয়ে ওদের মুখ বন্ধ করব কারণ আমরা চাকরি পাবার আগে পত্রপত্রিকায় সমাজের বিভিন্ন ঘটনায় দেখেছি টাকা দিয়ে অনেক অন্যায় কাজকে ধামাচাপা দেওয়া যায় তাই টাকাটাই আমাদের কয়েকজনের কাছে মুখ্য হয়ে গেল।
বাবা বলতেন নীতি দুই কি পানি খাবি আমিও তো তাই বাবার মত করে ভাবতাম নীতি নৈতিকতা নিয়ে কখনো কিছু ভাবি নি আমি দেখি যে টাকা দিয়ে বড় দল থেকে যেমন এমপি হবার মনোনয়ন কেনা যায় টাকা খরচ করে এম্পি মন্ত্রী হওয়া যায় চাকরি পাওয়া যায় বড় বড় অপরাধ করেও সাড়া পাওয়া যায় ইত্যাদি কি না করা যায় মানে আমাদের সমাজে বলতে গেলে টাকা দিয়ে সব কিছু করা যায় তাই আমিও টাকার পিছনে ছুটছি মান সম্মানের কথা ইজ্জত এর কথা কখনো ভাবিনি।
ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশ করে তাদের কাজ দিয়েছি কপি করা জিনিসের ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে কম দামের জিনিস বেশি দামে কিনেছি কমিশন নিয়েছি চালু আইটেম দাম কম দেখিয়ে অপ্রচলিত আইটেমের দাম বেশি দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিয়েছি।
কখনো কখনো ঠিকাদারি কাজের প্রথম পেজে ভালো করে পরের পেজে আইটেম চেঞ্জ করে কাজের টেন্ডার বেলুড় চেয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুন তাতে ঠিকাদার আর আমি দুজনেই লাভবান হয়েছি ম্যানেজ করেছি উপরের মানুষদের।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় আচার-আচরণে এমন ভাব করেছি যে আমি জিয়ার ক্রীতদাস আবার শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে তাড়াতাড়ি চরম বঙ্গবন্ধু প্রেমিক হয়ে গেছি আমরা সবাই দল বেধে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনে গোপনে এত টাকার আয়োজন করে দিয়েছি যে আওয়ামী লীগ নেতারা ভাবতে শুরু করেছেন আমরা তাদের ইলু গ্রাম ইউনিয়ন উপজেলা জেলা আওয়ামী লীগ যুবলীগ ছাত্রলীগ ইত্যাদির সব কমিটিতে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ঢুকিয়ে এমন অবস্থা করেছি যে সবাই ভাবেন আমরা খাটি বঙ্গবন্ধু প্রেমিক।
নতুন কমিটি করতে নিজ নির্বাচন করুক আর যাই করুক আমরা লোক ইউনিয়ন উপজেলা জেলা কমিটিতে থাকবেই এটা শিখেছি বিএনপি সরকারের আমলে শেষ সময় ও এমন করেছিলাম থাকি জিয়া প্রেমিক শাস্তি ইদানিং আমাদের সাথীদের সরকারি অফিসে গিয়ে আপনাদের মনে হতে পারে যে এটা আওয়ামী লীগের একটা বড় নেতা রুপিস আমরা কিন্তু আসলে তা না।
বিএনপি আমলে রেপ যেমন বহু জাতীয়তাবাদী নেতা কে ক্রসফায়ারে মেরেছে ইদানিং শেখ হাসিনার সরকার দুদক আর ক্রসফায়ারের সমানে চালাচ্ছে আমরা দল বেঁধে মানবাধিকার সংগঠন কে গোপনে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে ক্রসফায়ারের হাত থেকে বেশি কিন্তু পিছু ছাড়ে না।

সরকারকে চাপ দিয়ে নিজেদের অনুকূলে আইন করেছি অনেক কিন্তু তাও কাজ হয় না তাই বউ আর বাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে তিন চারটা গার্লফ্রেন্ড বানিয়েছি অবৈধ টাকা এখন আর পরিবারের লোকদের একাউন্টে রাখি না রাখি গার্লফ্রেন্ড এর একাউন্টে যাতে ধরা না পড়ি।
এতে আমাদের লাভ দুইটা এক টাকা নিরাপদে থাকে আর গার্লফ্রেন্ডের সাথে একটু মাস্তি করলেও বউ কিছু বলে না বড় অঙ্ক হলে সরাসরি বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে হুন্ডি কিংবা অন্য ভাবে।
আমরা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া কন্ট্রোল করি বা করতাম বড় বড় ঠিকাদারকে দিয়ে মোটা অংকের টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া আর নিউজ পোর্টাল আমাদের সর্বনাশ করে ফেলেছে এখন আর সব দোষ সরকারের ঘাড়ে চাপাতে পারছি না কিন্তু কয়েক দিন ধরে নিউজপোটাল আর সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাকে নিয়ে সম্প্রতি যা হচ্ছে তাতে আমার অতীত বর্তমান সব চলে আসছে আমাদের প্রায় নেংটা করে ফেলেছি ছেলেমেয়েদের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না এতে আমার ভিতর ও যেন জেগে উঠেছে তাই আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি আমার এই কৃতকর্মের জন্য আমাকে ক্ষমা করুন আমাকে ভালো হবার সুযোগ দিন আপনারা সবাই।

No comments:

Post a Comment

Home