প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিক্ষকদের নিবেদন - খবরের অন্তরালে

জাতীয়

সর্বশেষ সংবাদ

Tuesday, 5 March 2019

প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিক্ষকদের নিবেদন

প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিক্ষকদের নিবেদন
pohoto collected
মনিমুল.... হক
সকাল বেলা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে পল্টন আসার সময় প্রায় দিনই দেখি কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে আমাদের দেশের অধিকার বঞ্চিত মানুষরা ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করছেন। কেউ বা মাইকে বক্তৃতা দিয়ে নিজেদের অধিকারের দাবি তুলছেন। অধিকার বঞ্চিত হাসি বিহীন শুকনো মুখে নিজের দাবি উত্থাপনের সঙ্গে আশায় বুক বাঁধছেন, তাদের দাবি হয়তো একদিন বাস্তবায়িত হবে। তারাও নব প্রাণশক্তির বলে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজের শ্রমটুকু ঢেলে দিতে পারবেন।
গত রোববার সকালের দিকে প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে যখন আসছিলাম, তখন দেখি- যুবক বয়স থেকে প্রায় মধ্যবয়সী কয়েক’শ শিক্ষক-শিক্ষিকা এক দফা এমপিও ভুক্তির দাবিতে সেখানে ব্যানার-ফেস্টুন হাতে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করছেন। ব্যানারে বড় করে লেখা ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজে অনার্স মাস্টার্স কোর্সে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এক দফা এমপিওভুক্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি’।
আমি শিক্ষকদের এ মানববন্ধন দেখে দাঁড়ালাম, দীর্ঘক্ষণ তাদের বক্তৃতা ও দাবির কথা শুনলাম। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বেশ কিছু শিক্ষক একের পর এক চমৎকার বক্তৃতা করলেন। তাদের বক্তৃতার ভাষায় নতুন জাতি গড়নের প্রত্যয় ও দীর্ঘদিন যাবৎ বেতন-ভাতা না পেয়ে বহু কষ্টে ছাত্রদের পাঠদানের আকুতির কথা এমন ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল যে, ব্যস্ত ঢাকা শহরের পথচারীরা অনেকেই রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে সে কথা শুনছিলেন।
বক্তৃতায় শিক্ষকরা বার বার নিবেদনের সুরে বলছিলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের পরীক্ষা নিয়ে দেখেন, আপনার এ শিক্ষকরা ছাত্রদের ভালোভাবে পড়াতে পারে কি না? দেখেন আমরা ভবিষ্যৎ জাতি গড়ার যোগ্য কি না? দেখেন আমাদের মধ্যে সে গুনাগুণ আছে কি না?
শিক্ষকরা যখন তাদের বক্তৃতায় আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন; মনে হচ্ছিলো ভবিষ্যৎ একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে এমন আত্মবিশ্বাসী শিক্ষকই তো আমাদের চাই। শুধু প্রশ্ন হচ্ছে কতদিনে শিক্ষকদের এই নিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কানে যাবে?
পৃথিবীর কোনো দেশে মনে হয় এমন নজির নেই, শিক্ষকতা পেশায় রাষ্ট্রের একটু রেজিস্ট্রার ভুক্ত অনুমোদন পেতে বছরের পর বছর ধরে শিক্ষকদের রাজপথে মানববন্ধন করতে হয়, অনশন করতে হয়। কিছুদিন আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দেখেছি, দিনের পর দিন কনকনে শীতের মাঝে এমপিও ভুক্তির দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষকরা মানববন্ধন করেছেন। রাতভর অনশন করেছেন। এ নজিরবিহীন ঘটনা শুধু আমাদের দেশেই। বিধুর ভাবে একটি প্রশ্ন বিবেকে তাড়না দেয়, জাতি হিসেবে আমরা শিক্ষকদের কতটুকু সম্মান দিতে পারছি? রাষ্ট্র থেকে যখন একটি গোষ্ঠী বা দল অবহেলিত হয়, উপযুক্ত মান-মর্যদা থেকে বঞ্চিত হয়, সমাজও তখন নিস্তব্ধভাবে সে গোষ্ঠীর দিকে অবহেলার চোখেই দৃষ্টিপাত করে; প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা থেকে তারা বঞ্চিত হন।
শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে শিক্ষকরা হচ্ছেন জাতির নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসেই প্রাণ এর সঞ্চার সঞ্জীবিত থাকে। নিউক্লিয়াস যত সজীব ও সতেজ হয় দেহও তত সুস্থ ও সবল হয়ে ওঠে। তাই নিউক্লিয়াসের সুস্থতা ব্যতিরেকে একটি সুদৃঢ় মেরুদণ্ড গঠন অসম্ভব।
শিক্ষকরা নিজেদের বিকশিত করতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে যত বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবেন, একটু ভালভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা যত সুনিশ্চিতভাবে পাবেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও ততই প্রাণবন্ত ও শিক্ষাবান্ধব হয়ে ওঠবে। আমাদের দেশে প্রফেশনে সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক বৈষ্ণম্য থাকায় দেশের প্রধান সারির মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় অনেকটা আসতেই চান না বললেই চলে। তাছাড়া যে ক’জন পেশাটাকে আদর্শ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হলে নিয়োগের অনুমোদনটুকু নিশ্চিত করতেই তাদের বছরের পর বছর নানান কাঠখর পোহাতে হচ্ছে।
সেদিনের মানববন্ধন শেষ হওয়ার পরে কথা হয় মানববন্ধনের আয়োজনকারী- ‘বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক সমিতির সভাপতি নেকবর হোসাইন এর সঙ্গে। তিনি বলেন- ‘আমরা এমপিও ভুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডিও লেটারসহ ১০ম জাতীয় সংসদের শিক্ষামন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সুপারিশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবহেলার কারণে “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮” এ অন্তর্ভুক্ত না করায় আমরা ৩৫০০ জন শিক্ষক এবার এমপিওভুক্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’
‘আমরা সারাদেশে গত ২৪ তারিখে মানববন্ধন করেছি। সারাদেশ মিলে এ যাবৎ প্রায় ১০০’শ খানেক মানববন্ধন করেছি, মন্ত্রী সাংসদরা আশ্বাস দিচ্ছেন কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আর আজকে কেন্দ্রীয় ভাবে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে এই এক দফা দাবি জানাচ্ছি, আমাদের দাবি যেন সরকার দ্রুত বাস্তবায়ন করেন।’
আমাদের দেশে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত অর্থবরাদ্দ করতে না পারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে উচ্চশিক্ষা দিতে তথাকথিত সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন কলেজে উচ্চ শিক্ষা পাঠদান শুরু হয়। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ৮৫৭টি কলেজে পাসকোর্স, অনার্স, মাস্টার্স প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় ২৮ লক্ষ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এই তরুণ শিক্ষার্থীরা আমাদের উচ্চ শিক্ষার হারকে বৃদ্ধিসহ ভবিষ্যতে দেশ গড়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। আর এই বিশাল পরিমাণ শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার কাজটি করছেন শিক্ষকরা।
বিগত কয়েক বছরের পাসের হারের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের দেশে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পাশের হার প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। দেশের প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত আসন না থাকায়, উচ্চ শিক্ষার ভর্তি সঙ্কট মোকাবেলা করতে সরকার এখন জেলা, উপজেলা পর্যায়ের বেসরকারি কলেজগুলোতেও উচ্চ শিক্ষা পাঠ দান শুরু করেছেন। এটি নিঃসন্দেহ ভাল একটি উদ্যোগ। আমাদের গ্রাম গঞ্জের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা শিক্ষাটা কষ্ট করে হলেও চালিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যে কর্তা শিক্ষকগণ তারাই যদি নিয়োগ পেতে দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে দিনযাপন করেন তাহলে সেখানে শিক্ষা দানের বাতি কতটুকু আলো জ্বালাবে!
মনিমুল হক
পাকিস্তান আমলে শিক্ষাখাতে চরম বৈষ্ণমের প্রতিবাদে আমরা ঐতিহাসিক ’৬২’র শিক্ষা আন্দোলন করেছি। যা আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তিকে আরও মজবুত করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা দেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছি তা কি বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি শিক্ষকদের সে জায়গাটায় নিয়ে যেতে পেরেছি; শিক্ষার মান্নোয়নে সেভাবে কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পেরেছি? রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্র পরিচালনা করার জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়ত ট্রেনিং দিয়ে যেভাবে গড়ে তোলা হয়, ভবিষ্যতের জাতি নির্মাণের কারিগর শিক্ষকদের কি সেভাবে ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার কাজটি হয়? শিক্ষকরা তাদের শিক্ষকতার পেশা জীবনে এক থেকে সর্বোচ্চ দু’বার নিজেদের দক্ষ করার ট্রেনিংটা পেয়ে থাকেন, তা সে যেই স্তরের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকই হোন কেন।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি জাতিকে সবদিক দিয়ে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার প্রধান কারিগর হচ্ছেন শিক্ষকরা। যে দেশ বা জাতি যত বেশি শিক্ষদের মর্যাদা ও শ্রদ্ধার আসনে বসাতে পেরেছেন সে দেশ ও জাতি ততই কল্যাণমুখী হয়ে ওঠেছেন; বিশ্ব মানচিত্রে তাকালে এ দৃষ্টান্ত আজ আমাদের সকলেরই জানা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাণবন্ত ও শিক্ষাবান্ধব করে গড়ে তুলতে হলে, শিক্ষকদের মর্যদা ও দক্ষতার দিকটাতে নজর দেওয়া সমীচীন। বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের নিয়োগ দানে তাদের মেধা যাচাই এর জন্য সরকার ‘এনটিআরসিএ’ ও ‘পিএসসি’র মাধ্যমে নিবন্ধন পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। শিক্ষকতা পেশায় গমনেচ্ছুকরা নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্কুল-কলেজে শিক্ষাদানের যোগ্য হওয়ার নজির স্থাপন করছেন; তাহলে এ শিক্ষকদের এমপিও ভুক্তি করনে মন্ত্রণালয়ের এত দীর্ঘসূত্রিতা কেন?
একথা দৃঢ়ভাবে বলা যায়, শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারলে একটি সুসংহত ও সমৃদ্ধ জাতি এবং সভ্য আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলতে পারবো। এমপিও ভুক্তির দাবিতে একজন শিক্ষককেও যেন আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেশের দূরদুরান্ত থেকে ঢাকায় এসে মানবন্ধন করা কিংবা মন্ত্রণালয়ে ছুটাছুটি করে আর ভোগান্তি পোহাতে না হয়, যথাসময়ে তাদের দাবি ও অধিকার বাস্তবায়িত হয়; শিক্ষা বান্ধব বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের এটাই প্রত্যাশা।
লেখক ও সাংবাদিক

No comments:

Post a Comment

Home